মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘শুধু রিটেনটা পাস কর, ভাইবা আমরা দেখব’—এমন পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রেড ১১ থেকে ২০-এর সরকারি কর্মচারী নিয়োগে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি ‘চরম আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দাবি ছিল লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়ানো এবং ভাইভার প্রভাব কমানো। অথচ সরকার এর বিপরীত পথে হাঁটছে। এর ফলে নিয়োগে লবিং, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ বাড়তে পারে।
হাসনাত প্রশ্ন তুলে বলেন, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী ভালো করার পরও যদি ভাইভায় লবিং, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা অর্থের প্রভাবে পিছিয়ে যান, তাহলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের অর্থ কী?
তিনি জানান, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রেড ১১-১২-তে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার বিপরীতে ভাইভায় ৫০ নম্বর, গ্রেড ১৩-১৬-তে ৪০ এবং গ্রেড ১৭-২০-তে ২৫ নম্বর রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, এতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে ভাইভা বোর্ডের বিষয়ভিত্তিক বা ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়নের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
হাসনাত বলেন, লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠ। একই প্রশ্নে একই সময়ে সবাই পরীক্ষা দেন। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি বিষয়নির্ভর ও মূল্যায়নকারীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভাইভার নম্বর যত বাড়বে, ইন্টারভিউ বোর্ডের বিবেচনাধিকারও তত বাড়বে। এই ক্ষমতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুর্বল হলে পক্ষপাত, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গ্রেড ১১ থেকে ২০-এর কর্মচারীদের তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি সেবাদাতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গেই বেশি সম্পৃক্ত হন। তাই এ পর্যায়ের নিয়োগে রাজনৈতিক বা পক্ষপাতমূলক বিবেচনার সুযোগ তৈরি হওয়া গুরুতর বিষয়।
তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা যদি দলীয় বিবেচনায় দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে জনগণ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং জনঅসন্তোষ তৈরি হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো সরকারি কর্মসূচিও তখন দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
হাসনাত আরও বলেন, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়। রাষ্ট্রের হয়ে জনগণকে সেবা করার জন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের সময় রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত পরিচয় বা পক্ষপাতের প্রভাব রাখার সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে ওই কর্মচারী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।
তবে তিনি ভাইভা বাতিলের পক্ষে নন বলে জানান। তাঁর মতে, ভাইভা থাকতে পারে; তবে তা হতে হবে কাঠামোবদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে বড় ধরনের বিষয়নির্ভর নম্বর দিয়ে পাল্টে দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়।
হাসনাত বলেন, ভাইভা থাকলে নির্দিষ্ট বিধি ও মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডের ক্ষমতা থাকতে পারে, তবে তা যেন নিয়ন্ত্রণহীন বিবেচনাধীন ক্ষমতায় পরিণত না হয়। সরকারি নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতাকেই একমাত্র ভিত্তি করা উচিত।
তিনি বলেন, সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন চায়, তাহলে নিয়োগে বিবেচনাধীন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শেষে হাসনাত বলেন, তাঁদের আপত্তি ভাইভায় নয়; আপত্তি এমন ব্যবস্থায়, যেখানে ভাইভার বিষয়নির্ভর নম্বর দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় প্রমাণিত মেধাকে পরাজিত করার সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, এমন কোনো বাংলাদেশে তাঁরা ফিরে যেতে চান না, যেখানে সরকারদলীয় নেতা বলতে পারেন—‘তোরা রিটেনটা পাস কর, ভাইভা আমরা দেখব।’

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক