এ ঘটনায় মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। নিহতের ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ বলছে, মুক্তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পর স্পষ্ট হবে।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন মঙ্গলবার বলেন, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার মুঠোফোন থেকে নির্যাতনের ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্তাধীন।
নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয় ভাইয়ের কাছেপুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর সোহেল শিকদার মুক্তার নির্যাতনের ভিডিও তার ভাই তানভীর রহমানের কাছে পাঠান। একই সঙ্গে মেসেজে বোনকে নিয়ে যেতে বলা হয়।
স্বজনেরা মুক্তাকে ওই বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৩ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়িতে গিয়ে তারা মুক্তাকে জীবিত পাননি। পরে বাসার সিলিং ফ্যান থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করবে পুলিশ।
ভিডিওতে শিকল পরানো অবস্থায় মুক্তাপুলিশের কাছে থাকা ভিডিওতে মুক্তাকে পায়ে শিকল পরিয়ে খাটের সঙ্গে আটকে রাখার দৃশ্য দেখা গেছে। তাকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারধর করা হচ্ছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
ভিডিওতে মুক্তাকে নিজের কোনো অন্যায় না করার কথা বলতে এবং স্বামীকে ভালোবাসার কথা জানাতে শোনা যায়। একপর্যায়ে পাশের কক্ষে থাকা দুই সন্তান সাফওয়ান ও তাসফিয়ার কান্না শুনে তাদের ঘুম পাড়িয়ে আসার সুযোগ চান তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওটি সোহেলের মুঠোফোনেও পাওয়া গেছে। তদন্তে এটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দাম্পত্য কলহ ও অর্থ দাবির অভিযোগমুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল। সোহেল প্রথমে মুদি দোকান করলেও পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যবসায় প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার পর সংসারে অশান্তি আরও বাড়ে বলে স্বজনদের অভিযোগ।
তাদের ভাষ্য, কয়েক মাস আগে সোহেল মুক্তার ভাই তানভীরের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। টাকা দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করেও মুক্তাকে মারধর করা হতো। এ ছাড়া যৌতুকের চাপ এবং স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কের সন্দেহ থেকেও নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্বজনেরা জানান, সংসার টিকিয়ে রাখা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মুক্তা অনেক নির্যাতনের কথা পরিবারের কাছে প্রকাশ করতেন না।
মায়ের শূন্যতায় দুই শিশুমুক্তার দুই সন্তান সাফওয়ানের বয়স পাঁচ বছর এবং তাসফিয়ার চার বছর। মায়ের মৃত্যুর পর তারা স্বজনদের কাছে রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুরা এখনো ঘটনার আইনি বা বাস্তবতা বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি। তারা শুধু জানে, তাদের মা আর নেই।
তদন্তে উঠছে নানা প্রশ্নমুক্তার মৃত্যুর আগে ধারণ করা নির্যাতনের ভিডিওটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভিডিও ধারণের পর তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, কখন তার মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনোভাবে ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
তদন্তের অংশ হিসেবে মুঠোফোনের তথ্য, কল ও যোগাযোগের রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত, মরদেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তার দুই শিশুর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার কথা বিবেচনা করে ভিডিওটি পুনরায় ছড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক